Wednesday, October 28, 2020
Home জাতীয় রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচার: দ্য হেগ থেকে আদালত বাংলাদেশে স্থানান্তরের অনুরোধ

রোহিঙ্গা গণহত্যার বিচার: দ্য হেগ থেকে আদালত বাংলাদেশে স্থানান্তরের অনুরোধ

রোহিঙ্গাদের হত্যা ও নির্যাতনের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে যে শুনানি হবে, সেটি যেন নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগের পরিবর্তে অন্য কোন দেশে, বিশেষ করে বাংলাদেশে আদালত বসিয়ে করা হয়, সেরকম একটি আবেদন পেশ করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বা আইসিসির সব কার্যক্রম সাধারণত চলে নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগ শহরে। কিন্তু এই প্রথম এরকম কোন উদ্যোগ নেয়া হলো, যেখানে ভিক্টিম বা নির্যাতিতদের শুনানির জন্য আদালতকেই অন্য কোন দেশে বসানোর আবেদন জানানো হয়েছে।

আইসিসিতে এরকম একটি আবেদনের কথা জানা গেল এমন এক সময়, যখন মিয়ানমারের দুজন সৈন্য, যারা রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে হত্যা এবং ধর্ষণের ঘটনায় সরাসরি অংশ নেয়ার কথা স্বীকার করেছেন এবং দ্য হেগে গিয়ে পৌঁছেছেন বলে খবর বেরিয়েছে।

মিয়ানমারকে মানবতা বিরোধী অপরাধের অভিযোগে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর জন্য যে তদন্ত প্রক্রিয়াধীন, সেখানে এই দুটি ঘটনাকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনজীবীরা।

সম্ভাব্য দেশ বাংলাদেশ

নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত
নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত

দ্য হেগের যে বিচার আদালতে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের হত্যা-নিপীড়নের অভিযোগের শুনানি হওয়ার কথা, সেই আদালত যেন অন্য কোন দেশে বসিয়ে শুনানি করা হয়, সেরকম একটি আবেদন পেশ করা হয় গত মাসে।

আবেদনটি করেন রোহিঙ্গাদের পক্ষে কাজ করছে এমন তিনটি ‘ভিকটিম সাপোর্ট গ্রুপ‌ে’র আইনজীবীরা। তারা এমন একটি দেশে এই শুনানির অনুরোধ জানিয়েছেন, যেটি নির্যাতনের শিকার রোহিঙ্গাদের কাছাকাছি কোন দেশে হবে।

আবেদনে দেশের কথা উল্লেখ না থাকলেও, আইসিসি এই আবেদনের অগ্রগতির যে বিবরণী প্রকাশ করেছে, তাতে এই দেশটি ‘সম্ভবত বাংলাদেশ‌‌‌’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে আইসিসির তিন নম্বর ‘প্রি ট্রায়াল চেম্বার‌’ আদালতের রেজিস্ট্রি বিভাগকে আদেশ দিয়েছে, দ্য হেগ থেকে অন্য কোন দেশ, যেমন বাংলাদেশে আদালতের কার্যক্রম সরিয়ে নেয়ার সম্ভাব্যতা যাচাই করতে। আগামী ২১শে সেপ্টেম্বরের আগেই এই সম্ভাব্যতা যাচাই করে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে।

কেন আদালত অন্য দেশে বসানোর উদ্যোগ

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনজীবি আহমেদ জিয়াউদ্দীন বিবিসি বাংলাকে বলেন, অন্য দেশে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের শুনানির জন্য আদালত বসানোর উদ্যোগ খুবই বিরল এক ঘটনা। যেহেতু নির্যাতনের শিকার হাজার হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশেই আছেন, তাই এটি বাংলাদেশে হলে শুনানিতে তাদের সাক্ষ্য-প্রমাণ দেয়া সহজ হবে।

আবেদনকারি আইনজীবীরাও এরকম যুক্তিই দিয়েছেন।

সুপরিকল্পিতভাবে গণহত্যা চালানোর অভিযোগ আনা হচ্ছে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে
সুপরিকল্পিতভাবে গণহত্যা চালানোর অভিযোগ আনা হচ্ছে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে

শ্যানন রাজ সিং নামে একজন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনজীবি এ নিয়ে একটি ব্লগে লিখেছেন, “পাখির মত উড়ে গেলে, বৃষ্টিস্নাত দ্য হেগ থেকে কক্সবাজারের দূরত্ব আনুমানিক ৮,০০০ কিলোমিটার। সেখানকার শরণার্থী শিবিরে নির্যাতনের শিকার যে রোহিঙ্গারা থাকেন, তাদের জন্য এই দূরত্ব একেবারেই অনতিক্রম্য‍।”

এই ব্লগে তিনি আরও বলেছেন যে, আইসিসির রুল অনুযায়ী, স্বাগতিক দেশের (নেদারল্যান্ডস) বাইরে অন্য কোন দেশেও এই আদালতের কার্যক্রম চালানোর সুযোগ আছে। রোম স্ট্যাটিউটের একটি ধারা উল্লেখ করে তিনি জানান, আন্তর্জাতিক আদালত প্রয়োজন অনুযায়ী কোন মামলার পুরো বা আংশিক শুনানির জন্য অন্য কোন স্থানেও বসতে পারে।

মিয়ানমারের জন্য বড় ধাক্কা

এ সপ্তাহে প্রকাশ পাওয়া এই দু্টি ঘটনা রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের বিচারের দাবিতে যারা সোচ্চার, তাদের ভীষণভাবে উৎসাহিত করেছে। তাদের মতে, এর ফলে মিয়ানমার এখন রোহিঙ্গা গণহত্যার প্রশ্নে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) বড় ধরণের চাপের মুখে পড়তে পারে।

দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস এবং কানাডিয়ান ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন দেশত্যাগ করা মিয়ানমারের দুই সৈনিকের অপরাধের স্বীকারোক্তির যে বিশদ বর্ণনা প্রকাশ করেছে, সেটিকে অবশ্য মানবাধিকার আইনজীবীরা খুব বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন না।

ব্রাসেলসে কর্মরত আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনজীবী আহমেদ জিয়াউদ্দীন বিবিসি বাংলাকে বলেন, নিউ ইয়র্ক টাইমস বা অন্যান্য মিডিয়ার রিপোর্টে এই দুই সৈনিকের যে ভিডিও টেস্টিমোনি বা স্বীকারোক্তিমূলক ভাষ্যের কথা বলা হচ্ছে, সেটার হয়তো সাধারণ মানুষের দৃষ্টিকোন থেকে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এতদিন যে অভিযোগগুলো মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে করা হচ্ছিল, তাদেরই দুজন সদস্য সেই অপরাধের কথা স্বীকার করছেন।

নিশ্চুপ থেকে রোহিঙ্গা গণহত্যায় সায় দেয়ার অভিযোগ উঠেছে মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সুচির বিরুদ্ধে
নিশ্চুপ থেকে রোহিঙ্গা গণহত্যায় সায় দেয়ার অভিযোগ উঠেছে মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সুচির বিরুদ্ধে

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত এখনো পর্যন্ত এই দু্ই সৈনিকের ব্যাপারে কোন আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি। প্রসিকিউটরের অফিস থেকেও কিন্তু বলা হয়নি এরকম দুজন সৈনিক তাদের তত্ত্বাবধানে আছে। যদি এই খবর সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের তদন্তে হয়তো এই দুই সৈনিকের ঘটনা একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এর ফলে মিয়ানমারের বিপদে পড়ার সম্ভাবনা আছে। এটা একদিক থেকে খুবই ভালো খবর।

কিন্তু নিউ ইয়র্ক টাইমসের রিপোর্টে যে ভিডিও সাক্ষ্যের কথা বলা হচ্ছে, সেটার কি কোন মূল্য আছে?

আহমেদ জিয়াউদ্দীন বলছেন, ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট বা আইসিসির কাছে এই সাক্ষ্যের কোন মূল্য সেভাবে নেই।

“এর প্রথম কারণ হচ্ছে, আইসিসি নিজেই এখনো মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত করছে। সেই তদন্ত এখনো প্রক্রিয়াধীন আছে। তদন্ত চলাকালে আইসিসি বিভিন্ন সূত্র থেকে বিভিন্ন তথ্য পেতে পারে। নিউ ইয়র্ক টাইমসের যে রিপোর্টটির কথা বলা হচ্ছে, সেখানে দুজন সৈনিকের যে বিবরণ প্রকাশিত হয়েছে, আইসিসির তদন্তকারীরা সেসব তথ্যকে কেবল অতিরিক্ত কিছু তথ্য হিসেবে গণ্য করবেন। এর চেয়ে বেশি কিছু করার নেই।

“কারণ কেউ যদি কোন অপরাধ স্বীকার করতে চান, সেটা আইসিসির আইন বা নিয়ম অনুসরণ করে হতে হবে। আর এই কাজটা কেবল মাত্র আইসিসির প্রসিকিউটর বা তদন্ত কর্মকর্তাই করতে পারেন। অন্য কারও কাছে দেয়া স্বীকারোক্তি, সেটা বিদ্রোহী গোষ্ঠীর কাছেই হোক, বা অন্য কোন কর্তৃপক্ষের কাছে হোক, আইসিসির এখন যে তদন্ত চলছে, এর চেয়ে বেশি কোন মূল্য তাদের কাছে আছে বলে আমার মনে হয় না।”

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

Most Popular

ব্যারিস্টার রফিক-উল হক আর নেই

বাংলাদেশের সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হক মারা গেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিউন)। শনিবার সকাল সাড়ে ৮টার...

রাজধানীতে দুর্বৃত্তের ছুরিকাঘাতে যুবকের মৃত্যু

ঢাকা: রাজধানীর মিরপুরে দুর্বৃত্তের ছুরিকাঘাতে রিপন (২৬) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। রিপন নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার আব্দুর রহমানের ছেলে। শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) রাতে মিরপুর বড় মসজিদের...

করোনা ভাইরাস: পেশাগত পরীক্ষায় কেন অটো প্রমোশন চান মেডিকেল শিক্ষার্থীরা

বাংলাদেশে করোনাভাইরাস মহামারির কারণে গত পাঁচ মাস ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে আছেন মেডিকেলের এমবিবিএস শিক্ষার্থীরা। গত মে মাসে তাদের প্রফেশনাল বা ফাইনাল পরীক্ষা হবার কথা ছিল। কিন্তু...

ভারতীয় ক্রিকেটার কপিল দেব হৃদরোগে আক্রান্ত

কিংবদন্তি ভারতীয় ক্রিকেটার এবং ১৯৮৩ বিশ্বকাপজয়ী দলের অধিনায়ক কপিল দেব হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে নয়াদিল্লির হাসপাতালে অ্যানজিওপ্লাস্টি করিয়েছেন। টাইমস অব ইন্ডিয়া জানায়, মহামারির আগে সাম্প্রতিক সময়ে...

Recent Comments